30.5.11


মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষাকার্যক্রমের সাফল্য
kvn Avjg ev`kv

       নিরক্ষরতা একটি সামাজিক অভিশাপ। নিরক্ষর মানুষ চোখ থাকতেও যেমন অন্ধ তেমনি পশুর সমতুল্য। নিরক্ষর জনগোষ্ঠি কখনোই আধুনিকতা ও উন্নত সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনা। কথায় বলে- মূর্খের শতেক দোষ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে নিরক্ষর থাকাটা অপরাধও বটে। বলা হয়ে থাকে, ‘যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত।’ পবিত্র কুরআনেও আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘যে শিক্ষিত আর যে অশিক্ষিত-- তারা উভয়ে কি সমান হতে পারে?’ হজরত মুহাম্মদতো (সাঃ) একেকজন মুসলমানকে নিরক্ষরতামুক্ত করার শতের্ই প্রতিটি অমুসলিম যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দিতেন। এ থেকেও সাক্ষরতা বা শিক্ষার মর্যাদা সহজেই অনুমেয়। এজন্যই পবিত্র ইসলামে শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের দেশেদেশে এমনকি জাতিসংঘ সনদেও শিক্ষাকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতিদান করা হয়েছে।

          নবগঠিত বাংলাদেশে দীর্ঘদিন পর্যন্ত শিক্ষার হার ছিলো মাত্র ২৪%। ফলে তখন বিশাল নিরক্ষর জনগোষ্ঠিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের পাশাপাশি যথাযথ জাতীয় উন্নয়ন সম্ভবপর হয়নি এবং আর্থ-সামাজিকভাবেও যথেষ্ট পিছিয়েছিলো এদেশ। এমনি পরিস্থিতিতে সরকার ১৯৯৩ সালে সর্বপ্রথম বাধ্যতামূলক প্রাথমিকশিক্ষার পাশাপাশি গণশিক্ষা কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে নিরক্ষরতামুক্ত দেশগড়ার অঙ্গীকার ঘোষণা করে। এরই অংশ হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আওতায় চালু করা হয় ‘‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষাকার্যক্রম প্রকল্প।’’ প্রাক-প্রাথমিকস্তরের শিশুদের জন্য একটি সুসংগঠিত মসজিদভিত্তিক শিশুশিক্ষাকার্যক্রম চালুর মাধ্যমে প্রাথমিকপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তির হারবৃদ্ধি, প্রাক-প্রাথমিকস্তরের শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়ারোধ এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ শিক্ষার গুণগতমান অর্জনের ভিত্তিরচনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমাম ও শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাগ্রহণ এবং বিদ্যালয় গমণোপযোগী শিক্ষার্থীদের শুদ্ধভাবে কুরআনশিক্ষার মাধ্যমে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করাই প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এ প্রকল্পের অধীনে প্রথমপর্যায়ে প্রায় ৭৫হাজার শিশু ও বয়স্ক শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়। কিন্তু জনচাহিদার প্রেক্ষিতে এসময় অতিরিক্ত আরও প্রায় ২০হাজারসহ ৯৫হাজার শিক্ষার্থীকে সাক্ষর করে তোলা হয়। ফলে প্রথমপর্যায়ের সফলতা ছিলো ১২৬%। দ্বিতীয়পর্যায়ে ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ১২হাজার জনকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও অতিরিক্ত প্রায় একলাখ ১২হাজারসহ ৭ লাখ ২৪হাজার জনকে শিক্ষাদান করা হয়। এপর্যায়ের সফলতার হার ছিলো ১১৮%। প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয়পর্যায় সফলতার সাথে সুসম্পন্ন হওয়ায় দেশে-বিদেশে তা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। কারণ মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের অবকাঠামো নির্মানসহ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সংক্রান্ত কোনো ঝামেলা যেমন নেই তেমনি এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর ঝরেপড়া বা ড্রপ-আউটও (Drop out) একদম নেই বললেই চলে। মসজিদের ইমামগণই নামমাত্র (১২০০ টাকা) সম্মানীর বিনিময়ে মসজিদপ্রাঙ্গণে বসেই শিক্ষকতার কাজটি করে থাকেন। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে ৪-৫ বছরের শিশুদের জন্য পাঠ্য হচ্ছে দু‘টি সহজসাধ্য বাংলা ও ইসলামিয়াত বই যথাক্রমে আমার প্রথম পড়া এবং কায়দা ও দ্বীনিশিক্ষা আর ১৫বছরোর্ধ্ব বয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই মোট পাঁচটি যথাক্রমে ১. আমরা পড়ি আমরা শিখি (যাদ্বারা কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, কুটিরশিল্প, সমবায়, স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিস্কত্ম-পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশদূষণ ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষাদান করা হয়) ২. পড়া শিখি (বাংলা ১মখন্ড) ৩. পড়া শিখি (বাংলা ২য়খন্ড) ৪. আমরা শিখি গণিত এবং ৫. কায়দা ও আমপাড়া অর্থাৎ প্রকল্পের শতভাগ সাফল্যের কারণেই পরবর্তীতে তৃতীয়পর্যায়ে সম্প্রসারিত আকারে একে ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল মেয়াদে অনুমোদন দেয়া হয়। এ পর্যায়ে সারাদেশে ১২হাজার শিক্ষাকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১৬লাখ ৩৩হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়। এক্ষেত্রেও অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ৯হাজারসহ ১৬লাখ ৪৩হাজার জনকে  শিক্ষাদান করা হয় এবং এর অর্জিত সাফল্য ছিলো ১০১%।

          উল্লেখ্য যে, ধারাবাহিকভাবে চলমান এ প্রকল্পের আওতায় তৃতীয়পর্যায়ে দেশের ৬৪ জেলার ২৫৬টি উপজেলায় এ কার্যক্রম চালু ছিলো। এরই ধারাবাহিকতায় জানুয়ারি ২০০৬ থেকে ডিসেম্বর ২০০৮ সাল মেয়াদী ২১৬কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষে বর্তমানে প্রকল্পটির চতুর্থপর্যায়ের কার্যক্রম চলছে। চতুর্থপর্যায়ে সর্বমোট ১৬লাখ ৭৭হাজার ৬০০জনকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রাক-প্রাথমিক ও বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনার পাশাপাশি কোর্স সমাপ্তকারীদের পবিত্র কুরআন শিক্ষাদান করা হচ্ছে। যারা প্রথম ও দ্বিতীয়শ্রেণীতে ভর্তি হবে এবং ৬-১০ বছর বয়সী যেসব শিক্ষার্থী বিশুদ্ধভাবে কুরআন শিখতে পারেনি, তাদের শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষাদানের পাশাপাশি ইবাদতের নিয়ম-কানুন জানা ও মানার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার জন্যই কুরআন শিক্ষাকেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমানে মোট ৪৭৯টি উপজেলায় ১৮হাজার প্রাক-প্রাথমিক, ৭৬৮টি বয়স্ক এবং ১২ হাজার কুরআন শিক্ষাকেন্দ্র চালু রয়েছে। এসময়ে শুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষাদানের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে মোট ১২লাখ ৬০হাজার জন। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞানকে ধরে রাখার স্বার্থে সারাদেশে ৪৭৯টি মডেল রিসোর্স সেন্টার ও ৯৯৫টি সাধারণ রিসোর্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব রিসোর্স সেন্টার পাঠাগার হিসেবে ব্যবহৃত হলেও উপজেলাপর্যায়ে প্রকল্পের ‘সাব-অফিস’ হিসেবেও ভূমিকা পালন করছে। ফলে নব্যসাক্ষর, স্বল্পশিক্ষিত ও সাধারন গ্রামীণ পাঠকগণ তাদের আয়বর্ধক, দারিদ্র্যদূরীকরণে সহায়ক, সামাজিক কুসংস্কারমুক্ত, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন ও শিষ্টাচারমন্ডিত জীবনগড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

বলাবাহুল্য যে, সরকারের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের ফলে একদিকে যেমন বিদ্যালয় গমণোপযোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশাতীতভাবে বেড়েছে তেমনি গণশিক্ষার আওতায় নিরক্ষরতামুক্ত দেশগড়ার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে বর্তমানে দেশের শিক্ষার হার ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫% এ দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।