ওজোনস্তরের ক্ষয়
মানবসভ্যতার জন্য মহাবিপর্যয়!
শাহ আলম বাদশা
একবিংশ শতাব্দিতে শিল্পোন্নয়নসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যেমন ব্যাপক প্রসার ঘটেছে তেমনি এই বিজ্ঞানচর্চা ঘটাচ্ছে পৃথিবীর পরিবেশেরও ধ্বসাত্মক মহাবিপর্যয়! তাই বিশ্বব্যাপী জলবায়ূর তীব্র পরিবর্তন বা ঋতুবদল, ভুমিকম্প, সিডর, টর্ণেডো, ঝড়, বন্যা-খরা, জলোচ্ছ্বাস, এসিডবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, শৈত্যপ্রবাহ, ভূমিধস, পাহাড়ধস, তীব্র পানিসংকট, আগ্নেয়গিরির দাবদাহ ও অগ্নুৎপাতের বিপর্যয়, পানিদুষণ, শব্দদুষণ, এইড্স-বার্ডফ্লুর মতো প্রাণঘাতি রোগের প্রাদুর্ভাবসহ নানা অনাসৃষ্টি, বাতাসে গ্রিনহাউজ গ্যাসের মারাত্মক প্রাবল্য, ভূ-গর্ভ্যস্থ পানির আশংকাজনক সত্মরে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি আর্সেনিক বিষে তা একাকার হওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হওয়া এবং বিশেষত বায়ুম-লের ওজোনস্তরে বিরাট ছিদ্র বা ক্ষয় দেখা দেয়ায় তা সমগ্র সৃষ্টির জন্যই আজ যেনো এক মহাপ্রলয়েরই পদধ্বণি।
পরিবেশসমস্যা আজ কোনো আঞ্চলিক সমস্যা নয় বরং মারাত্মক এক আমত্মর্জাতিক সমস্যা। এ থেকে মুক্ত নয় সবুজ-শ্যামলিমাঘেরা আমাদের সোনার বাংলাদেশও। অপরিকল্পিত শিল্প-কারখানাস্থাপন, কৃষিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত কীটনাশক, জলাশয়, নদী ও সাগরদুষণ, ট্যানারিশিল্পের নিঃসৃত ক্রোমিয়াম, ব্রিকফিল্ড, ত্রটিপূর্ণ যানবাহন ও কল-কারখানার বিষাক্ত কালোধোয়া, ক্লিনিক্যাল ওয়েস্ট প্রভৃতি জঞ্জাল আমাদেরও নাভিশ্বাস তুলে ছেড়েছে। শুধু কি তা-ই, বিশ্বপরিবেশ সমস্যার কারণে ব্যাঙ-কচ্ছপ, কেঁচো এমনকি শামুকের মতো ক্ষুদ্র পা্রণীর জীবনও আজ সংকটাপন্ন। অবশ্য বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিবেশদুষণরোধে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যার সুফল আমরা ভোগ করছি। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ইটের ভাটায় জ্বালানী কাঠের ব্যবহার, যাবতীয় বর্জ্য আমদানী ও পাঁচবছরের পুরনো যানবাহন আমাদানী, পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার এবং দুই স্ট্রোকবিশিষ্ট যানবাহন নিষিদ্ধকরণ, পেট্রোল-ডিজেলচালিত যানবাহনকে সিএনজিতে রূপান্তরকরণ, বাংলাদেশে গ্রিনহাউজ গ্যাসের বিসত্মারিত তালিকাতৈরীকরণ, পরিবেশদুষণকারী যানবাহন, কলকারখানা বা ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনায়ন এবং বিশেষত ওজোনস্তর ক্ষয়কারী বসত্মুসমূহের ব্যবহার বন্ধে কর্মপরিকল্পনাগ্রহণ ও তার বাসত্মবায়ন ইত্যাদি।
যদিও এটা ঠিক যে, সকল প্রকার ভৌগোলিকতার বেড়াজাল ছিন্নকারী পরিবেশসমস্যাকে মোকাবেলা করা এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয় এবং প্রতিটি দেশই যদি বাংলাদেশের মতো পদক্ষেপও অব্যাহত রাখে তবুও এ সমস্যা অনেকাংশে কমে যেতে বাধ্য। তবে এও সত্য যে, আজকের পরিবেশবিপর্যয়ের মূল দায়ভার বর্তায় পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর। কারণ সারাবিশ্বে কৃষি ও শিল্পসংক্রামত্ম কর্মকা--র অবাধ বিসত্মৃতির ফলেই বায়ুম-লে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণও আতঙ্কজনকপর্যায়ে পৌঁচেছে। পাশাপাশি এসব দেখে-শুনে স্বল্পোন্নত ও অনুন্নোত দেশগুলোও বর্তমানে বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে।
অবশ্য বিশ্বপরিবেশ বিপর্যয়কারী ঘটনাগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহই হচ্ছে অন্যতম। গোলাবারম্নদ, বোমাসহ আগ্নেযাস্ত্র ব্যহারের ফলে যে মারাত্মক গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎপন্ন হয়, তাতে তাৎক্ষণিক ক্ষতির পাশাপাশি যুগযুগ ধরেই চলে এর অব্যাহত প্রভাব। হিরোসিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমানিক্ষেপ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক-ইরান যুদ্ধ, রাশিয়ার চেরনোবিল দুর্ঘটনা, টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা এবং এর জের ধরে সম্মিলিতভাবে ইরাক-আফগানিসত্মান আক্রমণ ও অব্যাহত যুদ্ধসহ পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে উৎপন্ন কার্বন-ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, সীসাসহ মারাত্মক বিষাক্ত গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে নভোম-লে ওজোনস্তর ক্ষয়ের ঘটনাই হচ্ছে মানবসভ্যতার জন্য সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ বিপদ। সর্বপ্রথম দক্ষিণমেরুর ওপর নভোমন্ডলের ওজোনস্তরে বিরাট একটি ছিদ্র আবিস্কারের ফলে বিজ্ঞানীদের মধ্যে শুরম্ন হয়ে যায় তোলপাড় ও আতঙ্ক। এই ওজোনস্তর যদি ক্রমাগত ক্ষয় হতেই থাকে এবং এধরনের ছিদ্রগুলো বন্ধ করা না যায়, তবে বিশ্বের জীব ও উদ্ভিদসমূহ হবে এর অত্যন্ত ক্ষতিকর অতিবেগুণী রশ্মির শিকার। ফলশ্রম্নতিতে পৃথিবী থেকে নিশ্চিন্ন হয়ে যাবে সভ্যতাগর্বী সৃষ্টিকূল, যাকে বলে কেয়ামতের আগেই কেয়ামত হওয়া, আরকি?
কিন্তু আশার ব্যাপার যে, দক্ষণমেরুর ওজোনস্তরের বিরাটকায় ছিদ্র দেখার পর থেকে তা বন্ধের ব্যাপারে অব্যাহত গবেষণা ও চেষ্টা-সাধনা শুরম্নর মাধ্যমে ওজোনসত্মর ছিদ্র বা ক্ষয়কারী গ্যাসের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে সফল হয়েছেন বিজ্ঞানী ও পরিবেশদরা। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত মন্ট্রিল প্রটোকল থেকে শুরম্ন করে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত কিয়োটো সম্মলন পর্যমত্ম সময়ে ব্যাপক পরিবেশসচেতনতা এবং পরিবেশ আন্দোলন গড়ে ওঠায় পরিবেশবিপর্যয়রোধে আন্তর্জাতিকপর্যায়ের কার্যক্রমও জোরদার হয়েছে। এ আমত্মর্জাতিক সমস্যা মোকাবেলায় ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৭৪টি দেশের সরকার প্রধান ও প্রতিনিধির উপস্থিতিতে রিও সম্মেলনে পরিবেশরক্ষায় বেশকিছু সিদ্ধান্তগ্রহণ গৃহীত হয়েছিলো এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশ আন্দোলন বর্তমানে অনেকদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কিয়োটো সম্মেলনেও এবার ওজোনস্তর ক্ষয়কারী গ্রিনহাউস গ্যাসনিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এবং তা যথাযথ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলেই ওজোনস্তর ক্ষয়ের মতো মহাপ্রলয়ের হাত থেকে বেঁচে যাবে অসহায় মানুষসহ সমগ্র প্রাণীকূল।
ওজোনসত্মরের ক্ষয়রোধ এবং ক্ষয়কারী বিকল্প দ্রব্যের ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলার জন্য জাতিসংঘের উদ্যোগে সারাবিশ্বে প্রতিবছর ১৬ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস’ হিসেবেও। বাংলাদেশও ১৯৯৫ সাল থেকে এ দিবস পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা